খুব ছোটবেলায় একবার বাবার সাথে কবিগান শুনতে গিয়েছিলাম। একটু বড় হলে প্রায়ই আশেপাশের গ্রামগুলোতে যাত্রাগান শুনতে যেতাম। বছরের প্রায় প্রতি ঋতুতেই চারপাশে উৎসব আয়োজন লেগে থাকত। কখনো কখনো সঙ্গী থাকতেন বাড়ির কাজের লোক অথবা গ্রামের সমবয়সী কেউ কেউ। আমাদের গ্রামেও হতো। মাঝে মধ্যে অনুশীলন দেখেও ভীষণ আনন্দ পেতাম। কথাবার্তা তেমন একটা না বুঝলেও বুঝতে পারতাম একজন গায়ক (বিবেক) কী সুন্দর গান করতে পারেন। মানুষ সম্মোহিত হয়ে তার গান শোনে। গান শুনে মনের গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন হয়। আহা, এমন করে যদি অভিনয় করে গাইতে পারতাম!

গানের সাথে নাকি মানুষের সংস্কার জড়িত। পরম্পরা বলেও এখানে একটি বিষয় থাকে। চাইলেই নাকি হয় না। নাচা যায় না। এমন মানুষ আছে গান গাওয়া, নাচা তো দূরের কথা কারো সামনে কথা বলতে গেলেই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের যুদ্ধ, উল্টাপাল্টা হতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে আমারও তাই হয়। যদিও সমস্ত- গ্রন্থ, আদিশাস্ত্র আমাদের ভয়শূন্য হতেই নির্দেশ দিচ্ছে, অভয় দিচ্ছে। তবুও।
যাত্রাগানের মাঝখানে হঠাৎ তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মনের মধ্যে আচমকা একটি ভয় ঢুকে গেল। এরপর থেকে বয়স যত বাড়ছে কেবলই মনে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভেতর দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে, রচু দিয়ে যুদ্ধে যুদ্ধে কোন শান্তি আসতে পারে না। বয়সের আধিক্যে ততোধিক মনে হচ্ছে সবাইকে ভাল না বেসে বিশ্বপ্রকৃতিকে অগ্রাহ্য করে পরমশান্তি লাভ সম্ভব নয়।

দুঃখ এবং দুঃখকে জয় করার বিষয়টি যতটুকুই পেয়েছি সেটুকু রবীন্দ্রপ্রেমি আতাউর রহমান মহোদয়ের কাছ থেকে। অন্যদিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক রানা কুমার সিন্হাও অগ্রগণ্য। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ভাবনায় অনেকেই নিজস্ব অবস্থান থেকে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। গীতবিতান নামক মহামূল্যবান গ্রন্থটি তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি। তাঁদের জন্য জানা কথাও ঘুরে ফিরে অনেকবার দেখতে হয়েছে। কোন কোন মনে গেঁথে গেছে।

আমার দুঃখ হরণের মন্ত্রটুকুতে রবীন্দ্রনাথ এসেছেন আপন সত্তা নিয়ে। কেউ কেউ হয়ত বিষয়টিকে অবিশ্বাস দিয়ে হাস্যকর করে তুলতে পারেন তবে আমার বিশ্বাস রবীন্দ্রপাঠভূবনে অনেকেরই জীবনে চরম দুঃখে রবীন্দ্রনাথ ‘গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ’ এঁকে দেন। যে পথে দুঃখ নিজেকে সৃষ্টিশীলতায়, সৃজনশীলতায় হারায়।

রবীন্দ্রনাথ নিজেও তো জীবনে কম দুঃখ বয়ে বেড়াননি। অনেকেই তাঁকে শুধু সছ¡ল জমিদার হিসেবে জানেন! প্রতিটি মানুষের ছোটখাট সুখ তো মূলত তার পুঞ্জীভূত দুঃখের নান্দনিক অংশবিশেষ। কখনো কখনো আলোর স্ফুরণের প্রাপ্তিকে ক্ষণিক মহত্বে উদ্ভাসিত হওয়া কিছুণ। দুঃখ তাই ব্যক্তির আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো এক মহৎ বস্তু। আমার ভেতরেও কিছু দুঃখবোধ কাজ করে। কিছু সুর নিয়ত গুণগুণ করে চলে, যেমন –

‘ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর,
তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি-
কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার
সে কথা যে যাই পাশরি।’
‘কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে’ কিংবা
‘অরূপ তোমার বাণী অঙ্গে আমার চিত্তে আমার মুক্তি দিক সে আনি’ অথবা
‘গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে’ নয়তো
‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি,
তখন তারে চিনি আমি তখন তারে জানি।’
কতশত গান! প্রকৃতি-পূজা-স্বদেশের গান জড়াজড়ি করে এগিয়ে চলে আমি কেবল পেছনে পড়ে রই। এখানেও গান এসে ভর করে-
‘আমি তোমার যাত্রীদলের রব পিছে,
স্থান দিয়ো হে আমায় তুমি সবার নিচে।
সবার শেষে যা বাকি রায় তাহাই লব,
তোমার চরণ ধূলায় ধূলায় ধূসর হবো।’
প্রকৃতি, গান, দুঃখ বিরহীর সাথেই বুঝি বেশি থাকে।
‘আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া
তোমার বীণা হতে আসিল নাবিয়া।
ভুবন মিলে যায় সুরের রণনে, গানের বেদনায় যাই যে হারায়ে।’
‘সেই ধ্বনিতে চিত্তবীণায় তার বাঁধিব বারে বারে।’
‘আমার বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে তোমার সুরে সুর মেলাতে।’
আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান ॥’

দুঃখের মধ্য দিয়েই নাকি পরমাত্মাকে অনুভব করা যায়। আমার মনে হয় দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মায়ের গভীরতর ¯েœহস্পর্শ পাওয়া যেন স্রষ্টারই ভিন্নরূপ। তিনিই করুণাধারায় বিগলিত করে আমাদের উর্ধ্বপানে আহ্বান করছেন, রসের খেলা খেলছেন। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঈশ্বরকে আমরা নিরাকারের রূপেই পাই। এও যেন এক বিষ্ময়মথিত রূপ। হতেই পারে। মা শরীর নিয়েও আছেন আবার শরীর ত্যাগ করেও আছেন! কাজেই গভীরতর বেদনা যখন আমাদের আচ্ছন্ন করে তখন প্রাণেও গানেরই স্পর্শ লাগে –
‘যখন তুমি বাঁধছিলে তার সে যে বিষম ব্যথা’;
‘যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিবে যায় বারে বারে / আমার জীবনে তোমার আসন গভীর অন্ধকারে’।
‘তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখো ওগো দুখ জাগানিয়া।’
বিশ্ববীণা আমার মধ্য দিয়েই তার শ্রেষ্ঠতম সুর বের করছে আমাকে চরম ব্যথা দিয়ে। অনন্ত বিশ্বের কবি রবীন্দ্রনাথ বলছেন-
‘দুঃখ জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকবেই তবু তার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে হবে। যে আমি ওই ভেসে চলে কালের ঢেউয়ে আকাশ তলে ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে- ও জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে সুখ-দুঃখের ঢেউয়ে দুলে চলেছে, আমি তাকে দেখছি নীরব কবির মতো, আমি মুক্ত, আমি শান্ত, আমি দৃপ্ত, আমার কোনো দুঃখ নেই- আমি জীবনের অনন্ত প্রবাহের একজন দর্শক।’

কাজেই তিনি আপন হতে বাহির হয়ে নিয়ত দুঃখের ভার আপন ভাবনা দিয়ে হরণ করে আমাদেরকেও দুঃখজয়ী মানুষ করে তুলছেন আর এ যাত্রা ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে। তিনি দুঃখির কাছে গাঢ় অন্ধকারে দুঃখ-আলো নামক ধ্রুবতারা হয়ে আছেন; এইখানে, এই রবীন্দ্রপাঠভূবনে কিংবা রবীন্দ্রবিশ্বে অন্তত দিশেহারা হবার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বিমান তালুকদার : সম্পাদক-মেঠোসুর, সাংগঠনিক সম্পাদক-জাতীয় কবিতা পরিষদ, সিলেট জেলা

Hits: 49

Leave A Comment

All fields marked with an asterisk (*) are required

18 − 3 =

Shares